ডিসেম্বরের শুরুর দিকেই ভাসানচরে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা

নিজস্ব প্রতিবেদক •

রোহিঙ্গাদের নিরাপদ আবাসন দিতে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত নোয়াখালীর ভাসানচর। কক্সবাজারের ঘিঞ্জি শরণার্থী শিবিরগুলো থেকে স্বেচ্ছায় যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই ভাসানচরে স্থানান্তরের কাজ শুরু হতে পারে। এ উপলক্ষে দ্বীপটিতে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দিতে সেখানে আরও বাড়ানো হয়েছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সদস্য। পৌঁছে গেছে বিভিন্ন এনজিও সংস্থার ত্রাণ সামগ্রী।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়, এপিবিএন-এর আইজিপি, নোয়াখালী জেলা প্রশাসকসহ সরকারি একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের জন্য সেখানে নতুন করে কর্মকর্তাসহ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এর আরও ২২২ জন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া এরইমধ্যে ২২টি এনজিও সংস্থার থেকে দেওয়া পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণসহ নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ভাসানচরে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, ভাসানচরের আবাসন প্রকল্প দেখে মুগ্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় যেতে ইচ্ছুক সাড়ে ‘৩শ’ পরিবারের আড়াই হাজার রোহিঙ্গা’কে ডিসেম্বরের প্রথম দিকেই ভাসানচরে হস্তান্তর শুরু করতে সকল প্রস্তুতি শেষ করেছে সরকার। বার্তা সংস্থা ইউএনবি আরও স্পষ্ট জানিয়েছে, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এর আগে, উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্প থেকে ইতোমধ্যে ৪ হাজার রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় ভাসানচরে যেতে রাজি বলে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়কে অবহিত করেছিল।

সোমবার রাত ৯টার দিকে জানতে চাইলে নোয়াখালী জেলা প্রশাসক (ডিসি) খোরশেদ আলম খান জানান, ‘ইতোমধ্যে ২২টি এনজিও সংস্থা থেকে পাওয়া পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণসহ নিত্য প্রয়োজীয় সামগ্রী ভাসানচরে পৌঁছেছে। তবে কী পরিমাণ ত্রাণ সেখানে গেছে সেটি এখন বলা সম্ভব না।’

তিনি বলেন, ‘মূলত স্বেচ্ছায় যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের একটি দলকে খুব দ্রুত কক্সবাজারের থেকে ভাসানচরে হস্তান্তর করা হবে। তাদের জন্য এসব ত্রাণ সামগ্রী।’

এদিকে সর্বশেষ (২৯ নভেম্বর) রবিবার সকালে ৩৫০ জনের একটি প্রতিনিধি দল ভাসানচরের প্রস্তুতি দেখতে সেখানে রওনা দেয়। প্রতিনিধি দলে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারসহ পুলিশ, নৌবাহিনী, এনজিও সংস্থা এবং গণমাধ্যম কর্মী রয়েছে। তারা আজ বিকেলে সেখান থেকে ফিরে আসেন।

আগামী ডিসেম্বরের শুরুর দিকে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের একটি দলকে ভাসানচরে বসবাসের জন্য নিয়ে যাওয়ার কথা সরকারের একাধিক সূত্র অনানুষ্ঠানিকভাবে জানালেও সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখ সম্পর্কে সরাসরি কেউ কথা বলতে চাননি। তবে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ডিসেম্বরের শুরুতেই টেকনাফ-উখিয়ার ক্যাম্পগুলো থেকে স্বেচ্ছায় যেতে রাজি হওয়া রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠানোর প্রস্তুতি নিয়েছেন তারা। প্রায় আড়াই হাজার রোহিঙ্গা সেখানে স্বেচ্ছায় যাচ্ছেন এমন তথ্য জানা গেলেও শেষ সময়ে এই সংখ্যার হেরফেরও হতে পারে।

এদিকে, নতুন রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে ভাসানচরে পাঠাতে গত মঙ্গলবার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে ভাসানচরের জন্য ফুড ও নন ফুড আইটেম চাহিদাপত্রের নমুনা সংযোজিত হয়েছে। এরইমধ্যে বিভিন্ন এনজিও ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের পর সম্ভাব্য সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রকল্প (ফুড ও নন ফুড) জমা দেওয়ার কথা সরকারকে জানিয়েছে।

ডিসেম্বরে ভাসানচরে রোহিঙ্গা হস্তান্তরের কথা রয়েছে উল্লেখ করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)-এর অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোশারফ হোসেন জানিয়েছেন, ‘অতি দ্রুত নতুন করে ককক্সবাজারের শরণার্থী শিবির থেকে আড়াই হাজার হাজার রোহিঙ্গা ভাসানচরে হস্তান্তর করা হবে। ফলে তাদের নিরাপত্তা দায়িত্বে পালনে কর্মকর্তাসহ ৯ ও ২ এপিবিএনের নতুন করে ২২২ জন পুলিশ সদস্য সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে। তারা আপাতত সেখানে গড়ে তোলা আবাসন প্রকল্পে উঠবে।’

এপিবিএনের আইজিপি আরও বলেন, এর আগে থেকে ভাসানচরে এপিবিএনের ৩০ জন সদস্য দায়িত্ব পালন করে আসছিল। তবে দ্বীপচরটির নিরাপত্তা বাড়ানো হবে। এজন্য এরইমধ্যে ভাসানচর নিয়ে আমাদের একটি পরিকল্পনা পুলিশ হেড কোয়ার্টারে পাঠানো হয়েছে। খুব শিগগির রোহিঙ্গাদের একটি দল সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে, সেভাবে আমাদেরও প্রস্তুতি রয়েছে।’

এদিকে, নতুন রোহিঙ্গা পরিবারগুলোকে ভাসানচরে পাঠাতে গত মঙ্গলবার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে ভাসানচরের জন্য ফুড ও নন ফুড আইটেম চাহিদাপত্রের নমুনা সংযোজিত হয়েছে। এরইমধ্যে বিভিন্ন এনজিও ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের পর সম্ভাব্য সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রকল্প (ফুড ও নন ফুড) জমা দেওয়ার কথা সরকারকে জানিয়েছে।

অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ সামছু-দৌজা বলেন, ‘স্বেচ্ছায় কিছু রোহিঙ্গা পরিবার ভাসানচরে যেতে রাজি হওয়ায় তাদের সেখানে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে। মূলত এ নিয়ে এখন বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়। এটা নিশ্চিত যে সরকার কাউকে জোর করে ভাসানচর পাঠাবে না। গত রবিবারও সরকারের একটি প্রতিনিধি দল ভাসানচর পরিদর্শন করেন।’

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অব্যাহত হামলা, নিপীড়ন ও হত্যার কারণে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয় সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা। এছাড়াও এর আগে এসে আশ্রয় নিয়েছিল বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা। বর্তমানে তাদের সংখ্যা কমপক্ষে ১১ লাখ। বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ ও অন্যান্য দেশের সহায়তায় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে ক্যাম্প নির্মাণ করে তাদের সাময়িক আশ্রয় দিলেও পুরো গোষ্ঠটিকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের প্রতি বরাবরই দাবি জানিয়ে আসছে। এ ব্যাপারে জোরালো আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। এরপরও আশ্রয় দেওয়ায় তাদের মানবিক নানা সুযোগ সুবিধার ব্যাপারও সরকারকে ভাবাচ্ছে। তাই এ পরিস্থিতির মধ্যেই রোহিঙ্গাদের উখিয়া ও টেকনাফের ঘিঞ্জি ক্যাম্পগুলো থেকে সরিয়ে আরও নিরাপদে রাখতে নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ভাসানচরে নিজস্ব অর্থায়নে বিপুল ব্যয়ে আশ্রয় ক্যাম্প নির্মাণ করে সেখানে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ভাসানচরের আশ্রয় ক্যাম্পে কমপক্ষে এক লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করতে পারবে।

জানা গেছে, সম্প্রতি রোহিঙ্গা নেতাদের ভাসানচরে নিয়ে গিয়ে দ্বীপটি এবং সেখানে নির্মিত অবকাঠামো তাদের ঘুরিয়ে দেখানো হয়। এরপর এসব নেতার অনেকে নানা ধরনের মত প্রকাশ করলেও ঘিঞ্জি বস্তিতে কষ্টে দিনযাপন করা রোহিঙ্গাদের অনেকেই ভাসানচরের আশ্রয় গ্রহণের ব্যাপারে ভেতরে ভেতরে আগ্রহ দেখাচ্ছেন এবং নিজেদের মধ্যে আলোচনা চালাচ্ছেন। বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতাও ভাসানচরে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের লোকজনকে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। এরপর অন্তত সাড়ে ৩০০ রোহিঙ্গা পরিবার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ে ধাপে ধাপে এসে ভাসানচরে যাওয়ার ব্যাপারে নিজেদের আগ্রহের কথা জানান। এরপরই তাদের সেখানে পাঠানোর বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে সরকার।

একটি সূত্র জানায়, রোহিঙ্গাদের এই দলটিকে নিরাপদে ভাসানচরে পাঠাতে পারলে আরও অনেক পরিবার সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে প্রকাশ্যে আগ্রহ প্রকাশ করবে বলে সরকার আশাবাদী।

এর আগে বাংলাদেশ সরকারের নিষেধাজ্ঞার পরও সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করে ধরা পড়া ৩০৬ জন রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে পাঠিয়েছিল সরকার। দেশে করোনাভাইরাসের প্রভাব চলায় তাদেরভাসানচরে পাঠানো হয়। এবার তাদের অনেকের স্বজন সেখানে যেতে আগ্রহ দেখিয়েছেন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের জন্য নিজস্ব তহবিল থেকে দুই হাজার ৩১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচরে আশ্রয় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে সরকার। জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সেখানকার ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা রক্ষা করতে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ এবং এক লাখ রোহিঙ্গা বসবাসের উপযোগী ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের এক সভায় ভাসানচরের জন্য নেওয়া প্রকল্পের খরচ ৭৮৩ কোটি টাকা বাড়িয়ে তিন হাজার ৯৫ কোটি টাকা করা হয়। বাড়তি টাকায় বাঁধের উচ্চতা ১০ ফুট থেকে বাড়িয়ে ১৯ ফুট করা, আনুষঙ্গিক সুবিধা বৃদ্ধিসহ জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের জন্য ভবন ও জেটি নির্মাণে খরচ হবে।