রফিকুল আমীনসহ ৩৫ আসামির ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে আছে ৮৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা

ডেসটিনির সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকার সম্পদ হাওয়া

ডেস্ক রিপোর্ট :

বেশুমার লাভের টোপ ফেলে দেশের ৩৫ লাখ মানুষের কষ্টের টাকা হাতিয়ে নেওয়া আলোচিত ডেসটিনি গ্রুপের অধিকাংশ শীর্ষ কর্মকর্তা এখন কারাগারে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দীর্ঘ তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, ডেসটিনি গ্রুপের এখনকার স্থাবর-অস্থাবর মোট সম্পদের পরিমাণ ৫৯০ কোটি ৩৩ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩৬ টাকা। তবে পোড়-খাওয়া গ্রাহকরা ডেসটিনির কাছেই পাবেন অন্তত ১৪ হাজার কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যমান সম্পদ গ্রাহকদের দেনার বোঝার চেয়ে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা কম।

স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের (ডিএমসিএসএল) সাতটি কোম্পানির আওতায় ৩৯৪ কোটি ৬৩ লাখ ৩২ হাজার ৮১০ টাকার এবং ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন লিমিটেডের (ডিটিপিএল) পাঁচটি কোম্পানির আওতায় ১৯৫ কোটি ৭০ লাখ ৫৩ হাজার ৫২৬ টাকার সম্পদ রয়েছে। আদালতের আদেশে ক্রোক অবস্থায় রয়েছে এসব সম্পদ।

দুদকের তদন্ত থেকে জানা যায়, কারাগারে বন্দি ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীনসহ ৩৫ আসামির ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে স্থিতি রয়েছে ৮৬ কোটি ৯২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৩৬ টাকা। আসামিদের স্বার্থসংশ্নিষ্ট ৫৮টি কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে স্থিতি রয়েছে ১৪৭ কোটি ৭ লাখ ৮৮ হাজার ১৪৭ টাকা।

এমডি রফিকুল আমীনসহ ১৩ আসামির ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রা-সংক্রান্ত হিসাবে স্থিতি আছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ১৭৪ মার্কিন ডলার। আদালতের আদেশে ব্যাংকে জমানো ওইসব দেশি ও বৈদেশিক মুদ্রা ফ্রিজ অবস্থায় আছে। এমডি রফিকুল আমীনসহ ১৪ আসামির স্থাবর সম্পদ ৪২ কোটি ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৫৫৯ টাকার। এই সম্পদও রয়েছে ক্রোক অবস্থায়।

ফলো করুন-
ভিডিও দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন সমকাল ইউটিউব
সূত্র জানায়, ডেসটিনির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ সারাদেশে ছড়িয়ে আছে। ওইসব দেখভাল করার জন্য আদালতের নির্দেশে রিসিভার নিয়োগ করা হয়েছে। ঢাকায় মহানগর পুলিশ কমিশনার এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় পুলিশ সুপারকে রিসিভার নিযুক্ত করা হয়েছে।

ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড ও ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন লিমিটেডের আওতায় কেনা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১১২টি প্রাইভেট কার ক্রোক অবস্থায় আছে।

৩৫ লাখের বেশি গ্রাহক ডেসটিনি গ্রুপের কাছে পাবেন অন্তত ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশনের আওতায় ২৬ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহকের পাওনা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির আওতায় সাড়ে আট লাখের বেশি গ্রাহক পাবেন প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।

গ্রাহকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ৩ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক সেনাপ্রধান ও ডেসটিনি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট লে. জেনারেল (অব.) হারুন-অর-রশিদ ও গ্রুপের এমডি রফিকুল আমীনসহ শীর্ষ ২২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ৩১ জুলাই দুদক আলাদা দুটি মামলা করে। দুদকের উপপরিচালক মোজাহার আলী সরদার বাদী হয়ে রাজধানীর কলাবাগান থানায় ৩২ নম্বর মামলা এবং তৎকালীন সহকারী পরিচালক (বর্তমানে উপপরিচালক) তৌফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে ৩৩ নম্বর মামলা করেছিলেন।

পরে কমিশনের সিদ্ধান্তে মোজাহার আলী সরদার ৩৩ নম্বর মামলা ও তৌফিকুল ইসলাম ৩২ নম্বর মামলা তদন্ত করেন। পরে তারা ২০১৪ সালের ৪ মে ৫১ জনের বিরুদ্ধে দুই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেন। আট বছরে বিচারকাজ শেষে গতকাল ৩৩ নম্বর মামলার রায় দেওয়া হলো।

দুদক সূত্র জানায়, এমএলএম ব্যবসার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ৪ হাজার ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুটি মামলা করা হয়। এর মধ্যে ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশনের আওতায় বৃক্ষরোপণের নামে ২ হাজার ২৫৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের আওতায় এমএলএম ব্যবসার নামে ১ হাজার ৮৬১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়।

বৃক্ষরোপণ প্রকল্পের নামে গ্রাহকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় ২ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্থানীয়ভাবে আত্মসাৎ করা হয় ২ হাজার ২৫৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। বিদেশে পাচার করা হয় ৫৬ কোটি টাকা। একই প্রক্রিয়ায় সমবায় ব্যবসার নামে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। এর মধ্য থেকে স্থানীয়ভাবে আত্মসাৎ করা হয় ১ হাজার ৮৬১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। বেস্ট এভিয়েশন, ডেসটিনি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রি ও ডেসটিনি এয়ার সিস্টেমসের মাধ্যমে বাকি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়।

ছয় কোটির বেশি কল্পিত ও অস্তিত্বহীন গাছ বিভিন্ন দরে গোল্ডেন, সিলভারসহ নানা প্যাকেজে ১৭ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহকের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। দুদক সরেজমিনে পরিদর্শন করে ৩২ লাখ ৫০ হাজার গাছের অস্তিত্ব পেয়েছে। অস্তিত্বহীন গাছ বিক্রি করে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে ২ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। পরে সেসব টাকা কোম্পানির মূল ব্যাংক হিসাব থেকে নিজেদের হিসাবে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করা হয়।

সমবায়ভিত্তিক ব্যবসার নামে ৪৬ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ৮ লাখ ৫০ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। ডিএমসিএসএলের আওতায় স্থাবর-অস্থাবর ৪০০ কোটি টাকার সম্পদের প্রমাণ মেলে। এ কোম্পানির চার হাজার কোটি টাকার দেনার হিসাব মিলেছে। ৩১টি ব্যাংকে খোলা প্রতিষ্ঠানের ৭২২টি হিসাব থেকে ১ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করেন ডেসটিনির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা।

আসামিরা বেস্ট এভিয়েশনের আওতায় বিমান লিজ, গ্রাউন্ড সার্ভিস ইকুইপমেন্ট, বিমানের পার্টস আমদানি, বৈদেশিক ক্রুদের বেতন-ভাতা ও প্রশিক্ষণ খরচের নামে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত ৪১ কোটি ১৯ লাখ ৭৯ হাজার ৮৫৫ টাকা যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, থাইল্যান্ড, হংকং ও সিঙ্গাপুরে পাচার করেন। ডেসটিনি অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের আওতায় বীজ আমদানির নামে হংকংয়ে পাচার করা হয় ১ কোটি ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ডেসটিনি এয়ার সিস্টেমস লিমিটেডের আওতায় ইয়েমেন এয়ারওয়েজের জেনারেল সেলস এজেন্টশিপসহ কার্গো জিএসএ নেওয়ার জন্য ১ কোটি ২১ লাখ ৫ হাজার টাকা ইয়েমেনে পাচার করা হয়।

আসামিরা ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন লিমিটেডের আওতায় প্রবাসী বাঙালিদের প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন প্যাকেজে ছয় কোটি গাছ বিক্রি দেখিয়ে সংশ্নিষ্ট বিনিয়োগকারীদের সম্মানী দেওয়ার নামে যুক্তরাষ্ট্র, হংকংসহ অন্যান্য দেশে পাচার করা হয় ৫৬ কোটি ১৯ লাখ ১৯ হাজার ৪০ টাকা।