রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঁচ বছরে ১৫ মাঝিসহ ৯৯ খুন : মামলা ১ হাজার ৯০৮টি

বিশেষ প্রতিবেদক :

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বর নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি ক্যাম্পে থাকছে এসব রোহিঙ্গা। মানবিক কারণে আশ্রয় দেয়ার পর তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। তবে রোহিঙ্গাদের এভাবে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা আশঙ্কা। রোহিঙ্গাদের নিয়ে এখন বিপাকে আছেন স্থানীয় বাসিন্দারাই।

সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয় শিবিরে দুর্গম ক্যাম্পগুলোতে সংঘবদ্ধ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা ‘টার্গেট কিলিংয়ে’ নেমেছে। শিবিরে একের পর এক মাঝি (রোহিঙ্গা নেতা) খুন হচ্ছেন। ১০ আগস্ট মঙ্গলবার মধ্যরাতেও দুই মাঝিকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। এ নিয়ে গত পাঁচ বছরে সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়েছেন অন্তত ১৫ জন মাঝি। গুমের শিকার হয়েছেন আরো অন্তত ১৫ জন। এর মধ্যে গত দুই মাসেই খুন হয়েছেন আটজন রোহিঙ্গা।

কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছে যে তথ্য আছে, তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রোহিঙ্গারা খুনোখুনি, অপহরণ, ধর্ষণ, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, মানব পাচার, অগ্নিসংযোগসহ ১৪ ধরনের অপরাধে জড়িত। এসব অপরাধের দায়ে ২০১৭ থেকে ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত থানায় ১ হাজার ৯০৮টি মামলা হয়েছে। আর এ সময়ের মধ্যে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৯৯টি।

জানা গেছে,টার্গেট করে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য সাধারণ রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি—আরসাকে (আল-ইয়াকিন নামেও পরিচিত) দায়ী করে আসছে। শিবিরের বেশির ভাগ রোহিঙ্গাই স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে যেতে ইচ্ছুক। কিন্তু আরসার সদস্যরা মিয়ানমারে ফিরতে চান না। তাই স্বদেশে ফিরতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাঁরা কাজ করছেন বা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাঁদের টার্গেট করেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী একের পর এক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাসী গোষ্ঠী শিবিরগুলোতে তাদের নেতৃত্ব যেকোনোভাবে ধরে রাখতে চায়।

মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে জোড়া খুনের ঘটনাটি ঘটেছে কক্সবাজারের উখিয়ার জামতলী রোহিঙ্গা শিবিরের দুর্গম পাহাড়ের ঢালে। নিহতরা হলেন ক্যাম্প-১৫ সি-১ ব্লকের আবদুর রহিমের ছেলে প্রধান মাঝি আবু তালেব (৪০) এবং সি/৯-এর ইমাম হোসেনের ছেলে সাব ব্লক মাঝি সৈয়দ হোসেন (৩৫)।

শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. কামরান হোসেন জানান, ৮-১০ জন দুষ্কৃতকারী ক্যাম্প-১৫-এর সি-৯ ব্লকের কাছে দুর্গম পাহাড়ের ঢালে সৈয়দ হোসেন ও আবু তালেবকে গুলি করে পালিয়ে যায়। দুজনকে উদ্ধার করে জামতলী এমএসএফ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান সৈয়দ হোসেন। আবু তালেবকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কুতুপালং হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তিনি জানান, ঘটনার পর শিবিরে ব্লক রেইড এবং অভিযান চলছে। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

উখিয়া থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে জানান, জামতলী শিবিরে রাতে রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকরা পাহারা দিয়ে থাকেন। সৈয়দ হোসেন ও আবু তালেব ওই স্বেচ্ছা পাহারার কার্যক্রম তদারক করছিলেন। তদারকি শেষে নিজেদের ঘরে ফেরার সময় সন্ত্রাসীরা তাঁদের ওপর অতর্কিতে হামলা ও গুলি চালায়। ওসি জানান, গতকাল বিকেল পর্যন্ত মামলা হয়নি। তবে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

সাধারণ রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, সন্ত্রাসীদের হাতে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১৫ জন রোহিঙ্গা মাঝি হত্যার শিকার হয়েছেন। গুমের শিকার হয়েছেন আরো সমসংখ্যক। গত জুন মাসে উখিয়ার বালুখালী-১৮ নম্বর শিবিরে হেড মাঝি মো. আজিমুদ্দিন সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হন।

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কুতুপালং শিবিরে আরসা সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হন রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ) সংগঠনের সভাপতি মহিব উল্লাহ। মহিব উল্লাহ রোহিঙ্গাদের স্বদেশে ফেরার দাবি-দাওয়া নিয়ে কাজ করছিলেন। মহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর গেল বছরের ২২ অক্টোবর বালুখালী শিবিরের মাদরাসায় একই সন্ত্রাসী দলের হাতে খুন হন ছয়জন নিরীহ রোহিঙ্গা।

মহিব উল্লাহ ও আজিমুদ্দিন হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত জড়িত ৩২ জন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ১২ জন হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এসব হত্যার পর শিবিরগুলোতে আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা বাহিনী রাতের বেলায় রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা পাহারার ব্যবস্থা করে। এ কারণে সন্ত্রাসীরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা আবারও মাথা চাড়া দিতে শুরু করেছে।

অতিরিক্ত রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার সামছুদ্দৌজা নয়ন জানিয়েছেন, শিবিরগুলোতে দুই হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মাঝি রয়েছেন। এই মাঝিরাই সাধারণ রোহিঙ্গাদের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। সন্ত্রাসীরা স্বদেশে ফিরতে ইচ্ছুক সাধারণ রোহিঙ্গাদের মনোবল দুর্বল করতে এবং মাঝিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে নানা কার্যক্রম থেকে হাত গুটিয়ে নিতে বাধ্য করতেই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে যাচ্ছে বলে রোহিঙ্গা শিবির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।

সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হওয়ার ভয়ে বহু রোহিঙ্গা মাঝি রাতের বেলায় শিবিরের বাইরে রাত কাটান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুতুপালং শিবিরের দুজন রোহিঙ্গা মাঝি গতকাল জানিয়েছেন, গত ছয় মাস ধরে শিবিরের বাইরে ঘর ভাড়া নিয়ে তাঁরা রাত কাটাচ্ছেন।

সাধারণ রোহিঙ্গাদের ভাষ্য, রোহিঙ্গা শিবিরে আরসা সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ সাধারণ রোহিঙ্গারা। শিবিরে ডাকাতি,চাঁদাবাজি,খুন,ধর্ষনসহ এমন কোন অপরাধ নেই যেখানে আরসা জড়িত নয়। তাদের মতে, নানা অপরাধের পাশাপাশি আরসা সন্ত্রাসীরা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের বিপক্ষে কাজ করে আরসা।

জঙ্গি সংগঠনটি ২০১৬ সালের অক্টোবরে এবং ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা চালায়। এই হামলার জবাবে সর্বাত্মক ও নিষ্ঠুর সামরিক অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী ও রাখাইনেরা। এ সময় প্রাণ বাঁচাতে কয়েকদিনের মধ্যে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। তাঁদের এখনও ফেরত নেয়নি মিয়ানমার সরকার।

প্রসঙ্গত সরকারি হিসাবে কক্সবাজার জেলার উখিয়া, টেকনাফ ও নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচরসহ প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। যাদের আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সহায়তায় খাবারসহ মানবিক সেবা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব রোহিঙ্গা আগমনের প্রায় পাঁচ বছর হলেও এখনও একজনকে ফেরত নেয়নি মিয়ানমার।