মেজর (অবঃ) সিনহার ফুসফুস ছিল ছিন্নভিন্ন

অনলাইন ডেস্ক •

মেজর (অবঃ) সিনহা মুহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার সাক্ষ্যদানকালে ময়না তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন,মেজর (অবঃ) সিনহার ফুসফুস ছিল ছিন্নভিন্ন, হৃদপিন্ডে দুটি ছিদ্র ও পাঁজরের দুটি হাঁড় ভাঙ্গা ছিল।

টেকনাফের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত মেজর (অবঃ) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের লাশের পেছনে তিনটি বুলেটের ছিদ্র ছিল। যারমধ্যে, কোমরের উপর ১ টি, পিঠের মাঝামাঝি ২ টি। ছিদ্র গুলোর ইনজুরি ছিলো আগ্নেয়াস্ত্রের ফায়ারের কারণে সৃষ্ট।

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে মেজর (অবঃ) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. রনধীর দেব নাথ (৪২) আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে এ জবানবন্দী দেন।

মঙ্গলবার ২১ সেপ্টেম্বর তৃতীয় দফায় সাক্ষ্য গ্রহণের দ্বিতীয় দিনে কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল এর আদালতে এ সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন করা হয়।

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. রনধীর দেব নাথ আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে আরো বলেন, নিহত সিনহার দেহের বাম বাহুতে ইনভার্টেট ওন্ড (Inverted wound) ছিল। বাম বাহুতে (Shoulder এ Inverted large wound) বর ক্ষত ছিল। বাম বুকের নীচের অংশে বড় (Inverted wound) ক্ষত ছিল। চতুর্থ ও পঞ্চম পাঁজরের হাড় ভাঙ্গা ছিল। Inverted large wound দিয়ে ২ টি গুলি প্রবেশ করে পিটের মাঝামাঝি Inverted ছিদ্র দিয়ে বের হয়ে যায়। হৃদপৃন্ডে ২ টি ছিদ্র ছিল। বাম ফুসফুস ছিন্নবিচ্ছিন্ন ছিল।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. রনধীর দেব নাথ আদালতে দেওয়া জবানবন্দীতে আরো বলেন, সিনহার মরদেহের উল্লেখযোগ্য ক্ষতের মধ্যে, বামগলায় ৪ টি সমান্তরাল অগভীর ক্ষত ছিল। যার নীচে মাংসপেশি ছেঁড়া ছিল। যা ধারালো প্রান্ত বিশিষ্ট কঠিন কোন বস্তু দিয়ে আঘাতের মাধ্যমে করা হয়েছে।

ডা. রনধীর দেব নাথ ২০২০ সালের ১ আগস্ট কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় মেজর (অবঃ) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন পেয়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মোঃ শাহীন আবদুর রহমান চৌধুরীর নির্দেশে ময়নাতদন্ত করে রিপোর্ট তৈরি করেন বলে আদালতে সাক্ষ্য দেন। ডা. রনধীর দেব নাথ কুতুবদিয়ার ধুরুংবাজার উত্তর নাথপাড়ার রেবতী রঞ্জন নাথের পুত্র।

এর আগে মঙ্গলবার ২১ সেপ্টেম্বর সকালে আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর চার্জশীটের অপর সাক্ষী হাফেজ জহিরুল ইসলাম (৩৫) এর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। হাফেজ জহিরুল ইসলাম বাহারছরার মারিশবুনিয়ার হাজী আবদুর রহমানের পুত্র। তিনি স্থানীয় দক্ষিণ মাথাভাঙ্গা জামে মসজিদের ইমাম।

রাষ্ট্র পক্ষে মামলাটির আইনজীবী ও কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) এডভোকেট ফরিদুল আলম, অতিরিক্ত পিপি এডভোকেট মোজাফফর আহমদ, এপিপি ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জিয়া উদ্দিন আহমদ সাক্ষীদের জবানবন্দী গ্রহণ করেন।

এসময় বাদী শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস এর আইনজীবী এডভোকেট মোহাম্মদ মোস্তফা, এডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট মাহবুবুল আলম টিপু, এডভোকেট ফারহানা কবির চৌধুরী, এডভোকেট মোহাম্মদ ছৈয়দুল ইসলাম, এডভোকেট এসমিকা প্রমুখ আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

আসামীদের পক্ষে আদালতে এডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত, এডভোকেট দিলীপ দাশ, এডভোকেট শামশুল আলম, এডভোকেট মমতাজ আহমদ (সাবেক পিপি) এডভোকেট মোহাম্মদ জাকারিয়া, এডভোকেট চন্দন দাশ, এডভোকেট এম.এ বারী, এডভোকেট ওসমান সরওয়ার শাহীন, এডভোকেট মোশাররফ হোসেন শিমুল প্রমুখ সাক্ষী হাফেজ জহিরুল ইসলাম ও ডা. রনধীর দেব-কে জেরা করেন।

এনিয়ে মঙ্গলবার ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই মামলার মোট ১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার ২২ সেপ্টেম্বর তৃতীয় দফায় তৃতীয় দিনের মতো এই মামলার অন্য সাক্ষী সেনা সদস্য সার্জেন্ট মোঃ আইয়ুব আলী এবং কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. মোঃ শাহীন আবদুর রহমান চৌধুরী’র সাক্ষ্য গ্রহণ ও তাদের জেরা করা হবে।

এর আগে দু’দফায় আরো ৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জেরা সম্পন্ন করা হয়। যাঁরা আগে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তারা হলো-মামলার বাদী শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী সাহিদুল ইসলাম সিফাত, মোহাম্মদ আলী, মোহাম্মদ আমিন, মোহাম্মদ কামাল হোসেন ও হাফেজ শহীদুল ইসলাম, আবদুল হামিদ, ফিরোজ মাহমুদ ও মোহাম্মদ শওকত আলী।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সেরেস্তাদার এম. নুরুল কবির জানান-সোমবার ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত একটানা ৩ দিন সাক্ষ্য দিতে আদালতে উপস্থিত থাকার জন্য চার্জশীটের ২৯ নম্বর পর্যন্ত আরো মোট ২৩ জন সাক্ষীকে সমন দেওয়া হয়েছিলো। তারমধ্যে প্রতিদিন ৪ জন করে সাক্ষী সোমবার আদালতে হাজিরা দিয়েছেন।

সাক্ষীরা যথারীতি আদালতে উপস্থিত থাকলেও আসামীদের পক্ষে সাক্ষীদের দীর্ঘ জেরার কারণে সমন দেওয়া সকল সাক্ষীদের সাক্ষ্য নির্ধারিত দিনে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছেনা বলে জানান-এপিপি ও কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জিয়া উদ্দিন আহমদ।

গত সোমবার থেকে সাক্ষ্য গ্রহণকালে মামলার ১৫ জন আসামীকেও কড়া নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়। মামলায় কারাগার থেকে এনে আদালতে যে ১৫ আসামিকে হাজির করা হবে, তারা হলো : বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, প্রদীপের দেহরক্ষী রুবেল শর্মা, টেকনাফ থানার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এএসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাগর দেব, এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ, পুলিশের মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।

গত ২৩ আগস্ট সকালে কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল এর আদালতে মামলার বাদী শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌসের সাক্ষ্য প্রদানের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর মেজর (অবঃ) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যা মামলার আনুষ্ঠানিক এ বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।