উখিয়া মডেল মসজিদ নির্মানে লোহার পাতের বদলে কাঠের তক্তা!

বিশেষ প্রতিবেদক :

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মডেল মসজিদ নির্মাণের ঢালাই কাজে লোহার পাতের বদলে ব্যবহার করা হচ্ছে আম গাছের তক্তা। ইতিমধ্যে মসজিদের নিচতলার (গ্রাউন্ড ফ্লোর) ঢালাই করা গ্রেট বিমও ধসে পড়েছে। মডেল মসজিদটির নির্মাণ কাজের সর্বত্র নিন্মমানের সরাঞ্জামাদি ব্যবহারেরও অভিযোগ উঠেছে।

মডেল মসজিদটির নির্মাণ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ‘প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে ৫৬০টি মডে মসজিদ ও ইসলামিক সাংষ্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় মডেল মসজিদটি স্থাপিত হচ্ছে হলদিয়া পালং ইউনিয়নের মরিচ্যা বাজারে।

কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী উপজেলা উখিয়ার একটি বড় বাণিজ্যিক এলাকা মরিচ্যা বাজারে মসজিদটি বাস্তবায়ন কাজ চলছে। সরেজমিন দেখা গেছে, ঢালাই করা বেশ কয়েকটি গ্রেট বিম ইতিমধ্যে হেলে পড়া অবস্থায় রয়েছে।

এগুলো ঢেকে রাখা হয়েছে বস্তা দিয়ে। বস্তাগুলো তুলে দেখা গেছে, বিমের ঢালাই দেওয়া সিমেন্টও সরে গেছে। এ সময় নির্মাণ কাজের সাথে জড়িত কাউকে স্পটে পাওয়া যায়নি। এলাকার লোকজন জানিয়েছেন, তদারক করার দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাসহ ঠিকাদারি প্রতিষ্টানের লোকজনও সেখানে নিয়মিত থাকেন না।

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় কাজ শেষ না হওয়ার আগেই ৮টি গ্রেডবিম (পিলার) ধসে পড়ায় উখিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য এম মনজুর আলম।

বিষয়টি আমলে নিয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করেন ইউএনও তানভীর হোসেন। এসময় তিনি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ পাওয়া সাথে সাথেই চলমান কাজ বন্ধ রেখে পুনরায় নতুনভাবে নির্মাণ কাজ শুরু করার নির্দেশনা দেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

পরিদর্শন কালে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রকল্প কর্মকর্তা মো. আল মামুন, উখিয়া পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান, ইউপি সদস্য যথাক্রমে এম মনজুর আলম,স্বপন শর্মা রনি, শাহাজাহান চৌধুরী, সরওয়ার কামাল বাদশা, বোরহান উদ্দিন চৌধুরী, শাহাজাহান শাহিনসহ স্থানীয় মুসল্লী, এলাকাবাসী এবং ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।

জানা যায়, উপজেলা পর্যায়ে মডেল মসজিদ বরাদ্দ আসলে সেটি হলদিয়া পালং ইউনিয়নের আওতাধীন মরিচ্যা বাজারের পশ্চিম পাশে নির্মাণের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। স্থানীয় ভাবে এ কাজ তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এস এম ইমরুল কায়েস চৌধুরী।

লিখিত অভিযোগে এম. মনজুর আলম উল্লেখ করেন,”মডেল মসজিদ নির্মাণকাজে ব্যবহৃত মালামাল ও সরঞ্জাম ২য় কিংবা ৩য় ক্যাটাগরির। যা জনসম্মুখে প্রমাণ মিলেছে। স্থানীয় ইউপি সদস্য হিসেবে নিজেও পরিদর্শন করে এটির সত্যতা পেয়েছি।”

তিনি আরো জানান, মনগড়া ভাবে নির্মাণ কাজের তদারকির কারণে ঠিকাদার নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে লাখ লাখ টাকা দূর্নীতি করছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার।

স্থানীয় ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) মেম্বার মঞ্জুর আলম আরো জানালেন-‘ সরকারের এমন একটি মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের তেমন তদারকি নেই। ঢালাই করার পর ৮টি বিম হেলে পড়েছে এবং আঁকা-বাঁকা হয়ে গেছে।’ ইউপি মেম্বার নিজেই দেখালেন, বিমগুলোর ঢালাই কাজে লোহার পাতের বদলে সেন্টারিং কাজে ব্যবহার করা হয়েছে আম গাছের তক্তা। অথচ সিডিউলে রয়েছে, ঢালাই কাজে অবশ্যই লোহার পাত ব্যবহার করতে হবে।

তাছাড়া নির্মাণ কাজে বালুসহ অন্যান্য সামগ্রীও নিন্মমানের ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ইউপি মেম্বার মঞ্জুর আলম। মসজিদ নির্মাণ কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারের এমন সব অনিয়মের কথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)সহ সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারি সংস্থা হচ্ছে কক্সবাজার গণপূর্ত বিভাগ। মেসার্স এস, আর, এন ইয়াকুব এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্টানের নামে প্রকল্পটি নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেলোয়ার হোসেন মিন্টু নামের একজন ঠিকাদার প্রকল্পটির কাজ করছেন। তিনি স্বীকারও করেছেন যে, উপরোক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্টান থেকে কাজটি তিনি কিনে নিয়ে (সাব ঠিকাদার) কাজ করা হচ্ছে।

ঠিকাদার জানান, চার-পাঁচ মাস আগে কাজটি শুরু করা হয়েছে। দুই বছরের মধ্যে কাজটি শেষ করার কথা। ঢালাই করার পর একটি গ্রেট বিম বৃষ্টির কারণে ধসে পড়ার কথা স্বীকার করলেও তিনি অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

মডেল মসজিদটির সার্বিক তত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা কক্সবাজার গণপূর্ত বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো আরিফুর রহমান নির্মাণ কাজের অভিযোগের ব্যাপারে কিছু ত্রুটির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি স্বীকার করে বলেছেন, লোহার পাতের সেন্টারিং দিয়ে ঢালাই করার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে গাছের তক্তা ব্যবহার করা হচ্ছে। ঢালাই করা বিম ধসে পড়ার কথাও সঠিক বলে জানিয়ে বলেন, ঢালাইয়ের পর বৃষ্টি হওয়ার কারণে একটি বিম ধসে পড়েছে।

কক্সবাজারের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ পরিচালক (ডিডি) ফাহমিদা বেগম বলেন- ঠিকাদার মসজিদের নিচতলার গ্রেট বিম ঢালাইয়ের পর আমার অফিসের সুপারভাইজার পরিদর্শন করে আমাকে জানিয়েছেন, সেখানে বেশ কয়েকটি বিম আঁকাবাঁকা হয়ে রয়েছে। তাছাড়া দুয়েকটা বিম ধসে পড়েছে।

তিনি বলেন, এটা মডেল মসজিদের নির্মাণ প্রকল্প। অত্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নির্মাণ কাজে কোনভাবেই কারও গাফিলতি বা দুর্নীতি করার সুযোগ এখানে হবে না।

মসজিদের নির্মাণ কাজের বিষয়ে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হোসেন বলেন-‘ আমি স্থানীয় লোকজনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ১৫ জুন নির্মাণ প্রকল্পটি সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। বিম হেলে পড়ার বিষয়টিও দেখেছি।’ তিনি বলেন, এসব দেখার পর কক্সবাজারের গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর হোসেন আরো বলেন, মডেল মসজিদ নির্মাণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। সেই প্রকল্প নিয়ে কোনও অনিয়ম, অবহেলা মেনে নেওয়া যায় না। প্রধানমন্ত্রীও মেনে নেবেন না। কাজে অসংগতি পাওয়ায় চলমান কাজ বন্ধ রেখে পুনরায় নতুনভাবে নির্মাণ কাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছি সংশ্লিষ্টদের। আমরা চাই মডেল মসজিদটি সঠিকভাবে মান ঠিক রেখে কাজ করা হোক।

কক্সবাজার গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ শাহজাহান জানিয়েছেন, মডেল মসজিদের নির্মাণ কাজে ঠিাকাদারের কারণে যতটুকু ত্রুটি হয়েছে তা কড়ায় কড়ায় আদায় করে নেয়া হবে।